আসুন সামাজিক শক্তির পথে ঐক্য প্রগতির সাথে
আমরা কোনো কিছুই সৃষ্টি করতে পারি না। শুধু রূপান্তর করতে পারি। এই
রূপান্তর করতে পারি আমরা আমাদের প্রতিদিনের ঘটে যাওয়া নানান ঘটনার
মধ্যদিয়ে। জ্ঞান এবং কাজের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত টেনে থাকি। সেটা
একটি সময়ের ঠিক বটে কিন্তু সারা জীবনের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত একই রকম থাকে
না। সময় ও স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সব কিছু গতিশীলতার মধ্য দিয়ে পরিবর্তনশীল।
তাই আজকের বাস্তবতায় আমরা বিশ্বব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরণের রূপান্তর দেখি।
তরুণ প্রজন্মের চিন্তার সাথে আমাদের চিন্তার অনেক ব্যবধান আছে। এই
ব্যবধানটি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় নতুন একটি
পর্যায় সৃষ্টি হচ্ছে। যারা নতুন তারা পুরাতনদের চিন্তার সাথে দ্বিমত করে
থাকে। করবে এটাই স্বাভাবিক। ভাইয়ে-ভাইয়ে, বোনে-ভাইয়ে, পিতা-পুত্রে এই
দ্বন্দ্ব দ্বিমত যেমন ব্যক্তি জীবনে, আবার ধনী পরিবারের সাথে গরীব
পরিবারের, এক গোষ্ঠীর সাথে আর এক গোষ্ঠীর, এক দেশের সাথে আর এক দেশের এই যে
ব্যবধান বা পার্থক্য সেটাই দ্বান্দ্বিক ভাবে বাস্তবতা। মালিক শ্রমিকের,
শাসক আর শোষিতের এই যে, দ্বন্দ্ব বা দ্বিমত এটাই বাস্তবতা, এই দ্বন্দ্ব আছে
বলেই আমাদের এত স্বপ্ন, এত গতিময়তা, এত উল্লাস, এত আবেগ, গতির মধ্যে
শক্তি। মনের শক্তি বা প্রাণের শক্তি তৈরি হয় দ্বিমত বা দ্বন্দ্বমূলক
বাস্তবতা থেকে। এই বিষয় আমরা যারা মানি না বা বিশ্বাস করি না, তাদের মধ্যে
যত বিভ্রান্তি, যত হতাশা, যত নৈরাজ্য, আমরা যারা মানব জাতি হিসাবে স্বীকার
করি, তাদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আমরা শ্রেষ্ঠ, আমরা মহৎ, আমরা
উত্তম ইত্যাদি। বিষয়টি আমরা এই সমাজ থেকে পেয়েছি, যাই হোক এই যে, মহৎ বা
শ্রেষ্ঠ ভাবতে শিখেছি এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষকে চেনা এবং পাল্টানোর
যে নিরন্তর সংগ্রাম সেই সংগ্রামের মধ্যে আমরা বেঁচে আছি। এই সংগ্রামটি ঘটছে
একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে। সেই নিয়মটি মানাই হলো আমাদের মূল কাজ। এই নিয়মটি
জানা এবং নিজেকে পাল্টানোর সংগ্রামটি হলো শিক্ষা। এই শিক্ষা আমরা কোথা থেকে
নেব ? গতানুগতিক স্কুল থেকে? কলেজ থেকে না বিশ্ববিদ্যালয় থেকে? সেটা কি
করে সম্ভব হবে? স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক
শিক্ষা নেয় সামাজিক শিক্ষা কি নেয়? যদি শিক্ষা নিয়ে থাকে তবে শিক্ষিত
মানুষের মধ্যে কি সব মানবিক গুণ দেখতে পাই? গ্রামে কঠোর শরীর কসরতের যে কাজ
একজন দিনমজুর করে থাকে, যেটা মাঠেও হতে পারে, আবার খামার বা কারখানাতেও
হতে পারে, সেখানে কাজ করতে করতে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে একজন দিনমজুর একজন
ক্ষুদে কৃষক অথবা জেলে তার যে জীবনের সংগ্রামের যে অভিজ্ঞতা, আর তার ছেলে
বা মেয়ে যে সবে মাত্র স্কুলে বা কলেজে পড়ে তার জীবনের অভিজ্ঞতা তো এক নয়।
গ্রামীণ জীর্ণ শীর্ণ জীবনের ঘানি টেনে রোদে পুড়ে, বর্ষায় ভিজে যে সংসার
যাত্রা নির্বাহ করেন তার জীবনে স্বপ্ন কি? সেই জেলে বা কৃষক বা দিনমজুরের
সন্তান নিয়ে স্বপ্নটা কি? যা সহজে উত্তর আমার ছেলে বা মেয়ে যেন মানুষের মতো
মানুষ হয়। ভালো একটা চাকুরী পায় বা মেয়েকে একটা ভালো ছেলের সাথে বিয়ে দিতে
পারে। এর সাথে রোগ শোক দায় দেনা নিয়ে তেন এক সাধারণ অভিজ্ঞতা যেটা হল ঘা
আছে কপালে ঘটে পরে সকালে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ইবাদত বা উপবাস একজন
প্রত্যাশা করে পরম কালণাময়ের কাছে নিজের রোগমুক্তি ছেলের, মেয়ে প্রতিষ্ঠা
ইত্যাদি আবেদন নিবেদন করে থাকে আর নিদেন পক্ষে সে যেন মৃত্যুর পরে স্বর্গ
বা বেহেস্ত থেকে আরাম আয়েশে জীবন কাটাতে পারে। প্রশ্ন হলো এই নিজের এবং
নিজের ছেলে মেয়ে বা স্ত্রী বাবা মায়ের জন্য ভালো কিছু হওয়া বা চাওয়ার মধ্য
দিয়েও তো মানুষের আশা আকাঙ্খা বুঝতে কারও বাকি থাকে না। চাওয়া এবং পাওয়া
নিয়ে এই জীবন সংসার। এটা তো গেল ব্যক্তি জীবনের সাধারণ ঘটনা, তার সাথে সমাজ
বা রাষ্ট্র বা বিশ্বের কথা হিসাব করলে তো ভিন্ন ভিন্ন উত্তর পাওয়ার কথা
নয়। মানুষ একা বাস করতে পারে না। সমাজবদ্ধ জীব। পাশাপাশি বাস, দেশ ও
বিশ্বকে আমরা আধুনিক যুগে পরিবারের মতো মনে করি। সমাজে বৈষম্য অপশাসন থাকলে
অস্থিরতা বাড়ে। গণতন্ত্র না থাকলে পরস্পরের প্রতি আস্থা বিশ্বাস কমে।
কিন্তু আজকের যুগে আমরা কি পারিনা একত্রে অপরের সাথে মিলে মিশে সামনে চলতে
অগ্রগতি, সমৃদ্ধির পথে চলতে।
ক্ষেত্রে আমাদের পারিবারিক ঐক্য, সামাজিক ঐক্য এবং সহমর্মিতার প্রয়োজন কিন্তু সেটা কোথা থেকে পাব? স্কুল কলেজের শিক্ষায় যে গলদ যে ‘টাকার বিনিময়ে শিক্ষা’ তার মাধ্যমে কি এটা সম্ভব। মোটেও সম্ভব নয়। আজকের যুগে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যাদেরকে বলা হচ্ছে মানুষ গড়ার কারিগর তারা কি শুধুই বেতন নিবেন আর ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশ্ন মুখস্ত করাবেন পরীক্ষা নিবেন। এখানেই কি দায়িত্ব শেষ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ কি শুধু শিক্ষক ছিলেন, দেহে ও মনে মানুষ হওয়ার যে সংগ্রাম সেটা কি শুধু কারিকুলাম ভিত্তিক শিক্ষা থেকে আসে? আসে সমাজ থেকে।
একটি গ্রামে ছেলে মেয়েদের খেলাধূলা, বিনোদন লেখাপড়া পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে উঠার জন্য, ক্লাব বা সামাজিক সংগঠন প্রয়োজন। সেই ক্লাব যদি সামাজিক কাজে যুক্ত লোকের দ্বারা পরিচালিত হয়, সেখানে যদি গ্রামের মধ্যে শিক্ষক, কৃষক, সাংবাদিক, আইনজীবী সম্পৃক্ত থাকে তাহলে তো অনেক গুলো সামাজিক কাজের মধ্য দিয়ে সমাজের অগ্রসর হয়। এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে দুটো মসজিদের কম নেই। কিন্তু বর্তমানে-কতগুলো গ্রামে ক্লাব আছে? ক্লাবের মধ্য দিয়ে গ্রামের পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছেলে মেয়েদের সামনে আনা যায়। একট্ িক্লাবে যারা সমাজকর্মী থাকেন তারা উদ্যোগ নিলে জনপ্রতিনিধি ও বিত্তশালীকে নিয়ে অর্থ তহবিল তৈরি করে গ্রামের গরীব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি দিতে পারে। গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কাজ হাতে নিতে পারে। গ্রামাঞ্চলে মাটি ও মানুষের সংস্কৃতি নিয়ে বছরে এক বা দুই বার বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান করতে পারে। গ্রামের ছেলে মেয়েদের বার্ষিক খেলাধূলা ও আনন্দ ভ্রমণও এ সকল ক্লাবের মধ্য দিয়ে হতে পারে। আর এসব সামাজিক কাজে স্কুল কলেজের শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠকের ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বরগণ গ্রামে গ্রামে ক্লাবগুলো সচল করতে সামাজিক ভূমিকা নিতে পারেন। আমরা যদি এগিয়ে যেতে চাই, তাহলে একটি আধুনিক পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয়। বর্তমানে সামাজিক নেতৃত্বের বড়ই সংকট। এই সংকট দুর করার জন্য একটি সামাজিক আন্দোলন দরকার। মানুষের একটি গতানুগতিক ধারণ আছে যে, কোনো ক্লাব করতে হলে অনেক টাকা লাগে অনেক বড় বিল্ডিং লাগে। ও ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে পারি আমরা। আমার যা আছে তাই নিয়ে শুাল করি, শুরুতে কয়েকজন উদ্যোগী মানুষ দরকার। যারা হবেন সামাজিক, আধুনিক, গণতান্ত্রিক মানুষ। সত্যিকার অর্থেই গণতান্ত্রিক মানুষ। নিজের সন্তানকে ভালো পরিবেশে বড় করতে চাই। সেই পরিবেশ বা সমাজ কি একা তৈরি করতে পারি? তার জন্য আরও অনেক মানুষকে নিয়ে শুরু করতে হবে। গ্রামে, ইউনিয়নে, উপজেলায়, জেলায়, সংসদে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে গ্রামীণ সমাজ কিভাবে সংগঠিত করতে পারা যায়। তরুণ প্রজন্মকে এ যুগের উপযোগী শিক্ষায় যেমন শিক্ষিত করে তুলতে হবে, তেমনি সামাজিক শিক্ষায়ও এ তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কাজে কর্মে চলনে বলনে চাঞ্চল্য সৃষ্টির জন্য সামাজিক আন্দোলনটা হতে হবে গ্রাম থেকে। ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা সবাই মিলে এই আন্দোলনটি করতে হবে নিজের জীবনটা সুন্দর করার জন্য, নিজের সন্তানের জীবন সুন্দর করার জন্য। সমাজের সবাই সুন্দরভাবে বাস করার জন্য এই সমাজ সংগঠন আন্দোলন হতে হবে। এখন প্রশ্ন হল এটা হলো না কেন? বা হচ্ছে না কেন? মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে দেশ গড়ে উঠনি সেই দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি মানুষের সাথে মানুষের বৈষম্য কমানো হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি গণতন্ত্রের চর্চ্চা হয়, মুক্তিদ্ধের চেতনা যদি জনগণই দেশের প্রকৃত মালিক হয়, তাহলে তার প্রতিফলনটা হতে হবে সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। গ্রামে গ্রামে ক্লাব সেই ক্লাবে ঠিক হবে ঐ গ্রামের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং উন্নয়নের বাধা কি সেটাও নির্ধারণ করতে হবে। একটি ইউনিয়নে যদি ১৫টি গ্রাম থাকে এবং প্রতিটি গ্রামে যদি ১০জন করে সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত থাকে তাহলে একটি ইউনিয়নে ১৫০জন মানুষকে সাথে নিয়ে ইউনিয়নের মেম্বর ও চেয়ারম্যান একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা, একটি ইশতেহার, একটি রূপকল্প তৈরি করে তরুণদের স্বপ্ন দেখাতে পারে। শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, খেলায়, কৃষি উৎপাদনে, মার্কেটিংয়ে, যোগাযোগে এই সামাজিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে অবশ্যই আমরা অগ্রসর হতে পারব।
প্রত্যেক গ্রামে যে, একাধিক মসজিদ বা ঈদগাহ আছে তার ও পরিচালনা কমিটি আছে। এই পরিচালনা কমিটি গুলো মনিটরিং হওয়া উচিৎ। মসজিদের ইমাম বা মুয়াজ্জিন সহ পরিচালনা কমিটি ধর্মের আলোকে আধুনিক সমাজ নির্মানে ভূমিকা নিচ্ছে কি না সেটা মনিটরিং হওয়া দরকার। বাজেটে ধর্মমন্ত্রণালয় যে বরাদ্দ পায় তা দিয়ে গ্রামেগঞ্জে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতি নৈতিকতা চর্চায় কি কি ভূমিকা রাখছে, তারা সমাজের অন্যায়, অনিয়মকে ঘৃনা করতে শিখছে কিনা সেটাও এই সামাজিক সংগঠন বিশেষ করে ক্লাবের মাধ্যমে মূল্যায়ন হওয়া দরকার। বাংলাদেশে সংবিধান পরিপন্থী কোন রাজনৈতিক সংগঠন সামাজিক বা ধর্মীয় সংগঠন চলতে পারে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশের জনগণকে সচেতন সংগঠনকে নিতে হবে। এখন প্রশ্ন হল এই কাজটি হুকুম করে করানো যায় না। যারা মানুষ হওয়ার সংগ্রাম করবে, সমাজটা পাল্টানোর সংগ্রাম করেন, সেই শক্তিকে এই কাজটি করার উদ্যোগ নিতে হবে, আসলে সবাই নিজেকে নিজের সংসারকে নিজের সন্তানকে অবস্থার উন্নতি চায়। এই চাওয়ার মধ্যে পরিবর্তনের শর্ত আছে। আমি নিজের সমৃদ্ধির চাই অন্যকে ক্ষতি করে এটা এক ধরণের মানষিকতা আবার নিজের সমৃদ্ধি চাই সমাজের সকলের সমৃদ্ধির সাথে সাথে, এই মানসিকতার লোকও সমাজে আছে। পৃথিবী এগিয়েছে সামাজিক বোধ সম্পন্ন মানুষের দ্বারা। আমরা মাঝে মাঝে হতাশা গ্রস্ত হই। বিভ্রান্ত হই। অনিয়ম দেখতে দেখতে আমরা নিয়মটা কে ভুলতে বসেছি। এই বোধটি হতাশা। আসলে নিয়ম সব সময় ছিল। আবার অনিয়মও ছিল। এই নিয়মের সাথে অনিয়মের যে লড়াই এটা চলছে তো চলছে। প্রগতির, ধর্ম, জীবনের ধর্ম, সমাজের ধর্ম এভাবে দ্বন্দ্বমূলক প্রগতিতে চলছে। এর মধ্যদিয়ে আমরা অগ্রসর হই। অগ্রসর হব আমি মাঝে মাঝে কষ্ট পাই যেখানে দেখি একজন শিক্ষক কটা টাকার লোভে প্রশ্নপত্র ফাস করে একজন ডাক্তার কটা টাকার জন্য রুগীর বিভিন্ন পরীক্ষার কমিশন বাণিজ্য করেন। একজন ইঞ্জিনিয়র কটা টাকার লোভে ফাইল আটকে টাকা নেয়। পুলিশ কটা টাকা লোভে গরীব ইঞ্জিন ভ্যান চালক লাইসেন্সবিহিন মোটর সাইকেল আরোহীর কাছ থেকে টাকা নেন। ভূমি অফিসার টাকার বিনিময়ে গরীব মানুষের জমি ভূমি দস্যুদের পাইয়ে দেন, আর জনগণের সেবা করার নামে ভোট নিয়ে জনপ্রতিনিধি সেজে জনগণকে জিম্মি করে টাকার পাহাড় বানান তখন মানুষ কোথায় যাবে? স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে প্রত্যেক শ্রেণি পেশার মানুষ তার উপর রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা সবাই মিলে আধুনিক গনতান্ত্রিকদের জনগণ হিসাবে মাথা উচু করে দাঁড়াব কি না? শুধু সমস্যা নয়। সমস্যার সমাধানও আমাদের করতে হবে, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির কথা বললে এক ধরণের মানুষ বেশ নড়ে চড়ে বসেন, আবার যত না কাজ করতে বা করাতে চাই তার চাইতে দেখতে বা উপভোগ করতে চাই। স্কুল কলেজের ছেলে মেয়েরা মোবাইলে গান শোনে কিন্তু নিজেরা গান শিখতে চায় না, খেলা দেখে কিন্তু নিজেরা খেলা করতে চায় না। এর কারণ কি? সামাজিক যে শক্তি, সে শক্তি আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যাচ্ছে, আত্মকেন্দ্রিক হলে বা অর্থ মাথায় দেওয়া না হলে এবং টাকা দিয়ে সব কিছু হাতের মুঠোয় আসবে। এমন ধারণাতে সামাজিক শক্তির ক্ষয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে কিছু কিছু সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেখানে ভোটাভুটির মাধ্যমে নেতা কর্মী মনোনীত হন, কিন্তু সামাজিক কাজ তেমন হয় না। সামাজিক শক্তি ক্ষয়ে যাওয়ায় এমন হয়েছে।
রাজনৈতিক শক্তি, সামাজিক শক্তি, সাংস্কৃতিক শক্তি যদি আধুনিক সমাজ নির্মাণে অগ্রসর হয় তাহলে মানুষের মধ্যে হতাশা। অস্থিরতা কমে, মানুষে মানুষে বন্ধুত্ব বাড়ে, অনৈক্য দূর হয়। কিন্তু এটা না হওয়ার মূল কারণ কি? কেন্দ্র থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রত্যেক জায়গায় স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার অভাব, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার অভাব। এর কারণ হলো মানুষকে সামাজিকভাবে ক্ষমতায়ন করা হচ্ছে না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চায় একটি লক্ষ্য ঠিক করা দরকার, সেটা সামাজিক শক্তিকে ঠিক করতে হবে। উপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে নয়,নিচের থেকে মাঠির শিকড় থেকে উঠে আসা সামাজিক শক্তির বিকাশ লাগবে। সেই বিকাশের জন্য আমরা অগ্রসর হতে চাই। কাজী নজরুলের সেই কথা ‘আমাদের কেউ নেতা নেই, আমাদের বিবেক হল আমাদের নেতা।’ মানুষের মধ্যে যে সুকুমার বৃত্তি আছে সেই সুকুমার বৃত্তিকে লালন করার জন্য সামাজিক আন্দোলন দরকার। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জনগণের সামনে দলকে নিজেকে পরিচিত করার জন্য কখনও কখনও কাউন্সিল সম্মেলন করে নেতা মনোনীত হয়। তাদের এখন সামাজিক আন্দোলন কি যে তেমন খেয়াল থাকে না। সাধারণ রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের কাজ সরকারের অর্থ লুট করা এবং সরকারি আমলাদের লুট করতে সহায়তা দেওয়া। এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে কাজ না করে টাকা গুলো আত্মসাৎ করা এবং গ্রামে গঞ্জের স্বল্প শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের ঘুষ দিয়ে চাকুরীতে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করান, তাদের সাথে যোগাযোগ রেখে গ্রামের মানুষের বেকায়দায় ফেলে পুলিশের ঘুষ দিয়ে আসা আর এমপি, ডিসি, এসপির সাথে সম্পর্ক আছে, এমন বিষয়গুলো জনগণের সামনে উপস্থাপন করে নিজেকে ক্ষমতাবান হিসাবে জাহির করাই হলো ক্ষমতাসীন দলের নেতা কর্মীর মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে সামাজিক শক্তি কোথা থেকে তৈরি হবে? পাড়ায় মহল্লায় যে সকল যুব শক্তি আছে তাদেরকে যুক্ত করার জন্যই সামাজিক শক্তি দরকার। মূল্যবোধ এবং তাালণ্যের শক্তি দিয়ে এই সামাজিক শক্তি তৈরি হতে পারে। এখানে মহাজ্ঞানী মহাজন আকাশ থেকে পড়ে না, এই মাটি ও মানুষের মধ্যেই নিহিত থাকে। সমাজ ও রাষ্ট্রে এই মহান ব্যক্তিদের অনুস্মরণ করার জন্য সামাজিক শক্তির দরকার। জেলা উপজেলায় যারা অগ্রসর মানুষ তাদের মিলিত শক্তিতে হতে পারে একটি শক্তি। সেই শক্তির আকর্ষণে আমরা গ্রামে গ্রামে সামাজিক শক্তি গড়ে তুলতে পারি। সিন্ডিকেট নয়, সামাজিক শক্তিই পারে আমাদের মনের দরজা খুলে দিতে, সব বাধা দুর করে, আলোর মশাল জ্বেলে, আমরা অন্ধকার দুর করতে চাই। সামাজিক শক্তি দিয়ে নতুন মুক্তির ঠিকানা তৈরি করতে হবে। বই পড়ে জ্ঞানী যেমন ভাল ভাল কথা বলতে পারেন, আবার সমাজ শক্তির উপর জ্ঞানী যারা তারা তালণদের ঘুম ভাঙাতে পারেন, জাগিয়ে তুলে স্বপ্ন দেখাতে পারেন। সব জড়তা, হীনতাতে ঝেড়ে ফেলে মোলদণ্ড সোজা করে দাঁড় করাতে পারেন। ‘ আমি শপথ করিতেছি যে, সর্বদা নিজেকে দেশের সেবাই নিয়োজিত রাখবো।’-এই শপথ বাক্য বুকে ধারণ করে তরুণদের জাগাতে পারেন। ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন। সেখানে কে কবি, কে নেতা, কে কর্মী, কে বক্তা, কে শ্রোতা বড় কথা নয়, আমরা সবাই কর্মী। কাজের যে শক্তি সেই শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করেই আমরা তৈরি করতে চাই সামাজিক শক্তি। সেই শক্তি যেন কোনো কিছুকে ধক্ষংসে মেতে না ওঠে। শুধু আরও ভালোর জন্য আরও উৎকর্ষের জন্য যেন গতিময় হই। ধনী গরিব, হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবাইকে একটি প্লাট ফর্মে নিয়ে একটি পরিচয় মানুষ হিসাবে আমরা সামনে চলতে চাই, তার জন্যই সামাজিক শক্তির দরকার। পৃথিবীতে বড় বড় বিজ্ঞানী, লেখক-কবি, সাংবাদিক, রাজনীতিক কেউ শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবেন নি। সমাজ ও রাষ্ট্র এবং বিশ্বকে নিয়ে ভেবেছেন। এই ভাবনাটি আজ সামাজিক আন্দোলনে নিতে হবে। আসুন আমরা সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত হই।
ক্ষেত্রে আমাদের পারিবারিক ঐক্য, সামাজিক ঐক্য এবং সহমর্মিতার প্রয়োজন কিন্তু সেটা কোথা থেকে পাব? স্কুল কলেজের শিক্ষায় যে গলদ যে ‘টাকার বিনিময়ে শিক্ষা’ তার মাধ্যমে কি এটা সম্ভব। মোটেও সম্ভব নয়। আজকের যুগে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যাদেরকে বলা হচ্ছে মানুষ গড়ার কারিগর তারা কি শুধুই বেতন নিবেন আর ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশ্ন মুখস্ত করাবেন পরীক্ষা নিবেন। এখানেই কি দায়িত্ব শেষ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ কি শুধু শিক্ষক ছিলেন, দেহে ও মনে মানুষ হওয়ার যে সংগ্রাম সেটা কি শুধু কারিকুলাম ভিত্তিক শিক্ষা থেকে আসে? আসে সমাজ থেকে।
একটি গ্রামে ছেলে মেয়েদের খেলাধূলা, বিনোদন লেখাপড়া পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে উঠার জন্য, ক্লাব বা সামাজিক সংগঠন প্রয়োজন। সেই ক্লাব যদি সামাজিক কাজে যুক্ত লোকের দ্বারা পরিচালিত হয়, সেখানে যদি গ্রামের মধ্যে শিক্ষক, কৃষক, সাংবাদিক, আইনজীবী সম্পৃক্ত থাকে তাহলে তো অনেক গুলো সামাজিক কাজের মধ্য দিয়ে সমাজের অগ্রসর হয়। এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে দুটো মসজিদের কম নেই। কিন্তু বর্তমানে-কতগুলো গ্রামে ক্লাব আছে? ক্লাবের মধ্য দিয়ে গ্রামের পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছেলে মেয়েদের সামনে আনা যায়। একট্ িক্লাবে যারা সমাজকর্মী থাকেন তারা উদ্যোগ নিলে জনপ্রতিনিধি ও বিত্তশালীকে নিয়ে অর্থ তহবিল তৈরি করে গ্রামের গরীব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি দিতে পারে। গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কাজ হাতে নিতে পারে। গ্রামাঞ্চলে মাটি ও মানুষের সংস্কৃতি নিয়ে বছরে এক বা দুই বার বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান করতে পারে। গ্রামের ছেলে মেয়েদের বার্ষিক খেলাধূলা ও আনন্দ ভ্রমণও এ সকল ক্লাবের মধ্য দিয়ে হতে পারে। আর এসব সামাজিক কাজে স্কুল কলেজের শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠকের ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বরগণ গ্রামে গ্রামে ক্লাবগুলো সচল করতে সামাজিক ভূমিকা নিতে পারেন। আমরা যদি এগিয়ে যেতে চাই, তাহলে একটি আধুনিক পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয়। বর্তমানে সামাজিক নেতৃত্বের বড়ই সংকট। এই সংকট দুর করার জন্য একটি সামাজিক আন্দোলন দরকার। মানুষের একটি গতানুগতিক ধারণ আছে যে, কোনো ক্লাব করতে হলে অনেক টাকা লাগে অনেক বড় বিল্ডিং লাগে। ও ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে পারি আমরা। আমার যা আছে তাই নিয়ে শুাল করি, শুরুতে কয়েকজন উদ্যোগী মানুষ দরকার। যারা হবেন সামাজিক, আধুনিক, গণতান্ত্রিক মানুষ। সত্যিকার অর্থেই গণতান্ত্রিক মানুষ। নিজের সন্তানকে ভালো পরিবেশে বড় করতে চাই। সেই পরিবেশ বা সমাজ কি একা তৈরি করতে পারি? তার জন্য আরও অনেক মানুষকে নিয়ে শুরু করতে হবে। গ্রামে, ইউনিয়নে, উপজেলায়, জেলায়, সংসদে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে গ্রামীণ সমাজ কিভাবে সংগঠিত করতে পারা যায়। তরুণ প্রজন্মকে এ যুগের উপযোগী শিক্ষায় যেমন শিক্ষিত করে তুলতে হবে, তেমনি সামাজিক শিক্ষায়ও এ তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কাজে কর্মে চলনে বলনে চাঞ্চল্য সৃষ্টির জন্য সামাজিক আন্দোলনটা হতে হবে গ্রাম থেকে। ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা সবাই মিলে এই আন্দোলনটি করতে হবে নিজের জীবনটা সুন্দর করার জন্য, নিজের সন্তানের জীবন সুন্দর করার জন্য। সমাজের সবাই সুন্দরভাবে বাস করার জন্য এই সমাজ সংগঠন আন্দোলন হতে হবে। এখন প্রশ্ন হল এটা হলো না কেন? বা হচ্ছে না কেন? মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে দেশ গড়ে উঠনি সেই দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি মানুষের সাথে মানুষের বৈষম্য কমানো হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি গণতন্ত্রের চর্চ্চা হয়, মুক্তিদ্ধের চেতনা যদি জনগণই দেশের প্রকৃত মালিক হয়, তাহলে তার প্রতিফলনটা হতে হবে সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। গ্রামে গ্রামে ক্লাব সেই ক্লাবে ঠিক হবে ঐ গ্রামের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং উন্নয়নের বাধা কি সেটাও নির্ধারণ করতে হবে। একটি ইউনিয়নে যদি ১৫টি গ্রাম থাকে এবং প্রতিটি গ্রামে যদি ১০জন করে সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত থাকে তাহলে একটি ইউনিয়নে ১৫০জন মানুষকে সাথে নিয়ে ইউনিয়নের মেম্বর ও চেয়ারম্যান একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা, একটি ইশতেহার, একটি রূপকল্প তৈরি করে তরুণদের স্বপ্ন দেখাতে পারে। শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, খেলায়, কৃষি উৎপাদনে, মার্কেটিংয়ে, যোগাযোগে এই সামাজিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে অবশ্যই আমরা অগ্রসর হতে পারব।
প্রত্যেক গ্রামে যে, একাধিক মসজিদ বা ঈদগাহ আছে তার ও পরিচালনা কমিটি আছে। এই পরিচালনা কমিটি গুলো মনিটরিং হওয়া উচিৎ। মসজিদের ইমাম বা মুয়াজ্জিন সহ পরিচালনা কমিটি ধর্মের আলোকে আধুনিক সমাজ নির্মানে ভূমিকা নিচ্ছে কি না সেটা মনিটরিং হওয়া দরকার। বাজেটে ধর্মমন্ত্রণালয় যে বরাদ্দ পায় তা দিয়ে গ্রামেগঞ্জে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতি নৈতিকতা চর্চায় কি কি ভূমিকা রাখছে, তারা সমাজের অন্যায়, অনিয়মকে ঘৃনা করতে শিখছে কিনা সেটাও এই সামাজিক সংগঠন বিশেষ করে ক্লাবের মাধ্যমে মূল্যায়ন হওয়া দরকার। বাংলাদেশে সংবিধান পরিপন্থী কোন রাজনৈতিক সংগঠন সামাজিক বা ধর্মীয় সংগঠন চলতে পারে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশের জনগণকে সচেতন সংগঠনকে নিতে হবে। এখন প্রশ্ন হল এই কাজটি হুকুম করে করানো যায় না। যারা মানুষ হওয়ার সংগ্রাম করবে, সমাজটা পাল্টানোর সংগ্রাম করেন, সেই শক্তিকে এই কাজটি করার উদ্যোগ নিতে হবে, আসলে সবাই নিজেকে নিজের সংসারকে নিজের সন্তানকে অবস্থার উন্নতি চায়। এই চাওয়ার মধ্যে পরিবর্তনের শর্ত আছে। আমি নিজের সমৃদ্ধির চাই অন্যকে ক্ষতি করে এটা এক ধরণের মানষিকতা আবার নিজের সমৃদ্ধি চাই সমাজের সকলের সমৃদ্ধির সাথে সাথে, এই মানসিকতার লোকও সমাজে আছে। পৃথিবী এগিয়েছে সামাজিক বোধ সম্পন্ন মানুষের দ্বারা। আমরা মাঝে মাঝে হতাশা গ্রস্ত হই। বিভ্রান্ত হই। অনিয়ম দেখতে দেখতে আমরা নিয়মটা কে ভুলতে বসেছি। এই বোধটি হতাশা। আসলে নিয়ম সব সময় ছিল। আবার অনিয়মও ছিল। এই নিয়মের সাথে অনিয়মের যে লড়াই এটা চলছে তো চলছে। প্রগতির, ধর্ম, জীবনের ধর্ম, সমাজের ধর্ম এভাবে দ্বন্দ্বমূলক প্রগতিতে চলছে। এর মধ্যদিয়ে আমরা অগ্রসর হই। অগ্রসর হব আমি মাঝে মাঝে কষ্ট পাই যেখানে দেখি একজন শিক্ষক কটা টাকার লোভে প্রশ্নপত্র ফাস করে একজন ডাক্তার কটা টাকার জন্য রুগীর বিভিন্ন পরীক্ষার কমিশন বাণিজ্য করেন। একজন ইঞ্জিনিয়র কটা টাকার লোভে ফাইল আটকে টাকা নেয়। পুলিশ কটা টাকা লোভে গরীব ইঞ্জিন ভ্যান চালক লাইসেন্সবিহিন মোটর সাইকেল আরোহীর কাছ থেকে টাকা নেন। ভূমি অফিসার টাকার বিনিময়ে গরীব মানুষের জমি ভূমি দস্যুদের পাইয়ে দেন, আর জনগণের সেবা করার নামে ভোট নিয়ে জনপ্রতিনিধি সেজে জনগণকে জিম্মি করে টাকার পাহাড় বানান তখন মানুষ কোথায় যাবে? স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে প্রত্যেক শ্রেণি পেশার মানুষ তার উপর রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা সবাই মিলে আধুনিক গনতান্ত্রিকদের জনগণ হিসাবে মাথা উচু করে দাঁড়াব কি না? শুধু সমস্যা নয়। সমস্যার সমাধানও আমাদের করতে হবে, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির কথা বললে এক ধরণের মানুষ বেশ নড়ে চড়ে বসেন, আবার যত না কাজ করতে বা করাতে চাই তার চাইতে দেখতে বা উপভোগ করতে চাই। স্কুল কলেজের ছেলে মেয়েরা মোবাইলে গান শোনে কিন্তু নিজেরা গান শিখতে চায় না, খেলা দেখে কিন্তু নিজেরা খেলা করতে চায় না। এর কারণ কি? সামাজিক যে শক্তি, সে শক্তি আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যাচ্ছে, আত্মকেন্দ্রিক হলে বা অর্থ মাথায় দেওয়া না হলে এবং টাকা দিয়ে সব কিছু হাতের মুঠোয় আসবে। এমন ধারণাতে সামাজিক শক্তির ক্ষয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে কিছু কিছু সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেখানে ভোটাভুটির মাধ্যমে নেতা কর্মী মনোনীত হন, কিন্তু সামাজিক কাজ তেমন হয় না। সামাজিক শক্তি ক্ষয়ে যাওয়ায় এমন হয়েছে।
রাজনৈতিক শক্তি, সামাজিক শক্তি, সাংস্কৃতিক শক্তি যদি আধুনিক সমাজ নির্মাণে অগ্রসর হয় তাহলে মানুষের মধ্যে হতাশা। অস্থিরতা কমে, মানুষে মানুষে বন্ধুত্ব বাড়ে, অনৈক্য দূর হয়। কিন্তু এটা না হওয়ার মূল কারণ কি? কেন্দ্র থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রত্যেক জায়গায় স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার অভাব, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার অভাব। এর কারণ হলো মানুষকে সামাজিকভাবে ক্ষমতায়ন করা হচ্ছে না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চায় একটি লক্ষ্য ঠিক করা দরকার, সেটা সামাজিক শক্তিকে ঠিক করতে হবে। উপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে নয়,নিচের থেকে মাঠির শিকড় থেকে উঠে আসা সামাজিক শক্তির বিকাশ লাগবে। সেই বিকাশের জন্য আমরা অগ্রসর হতে চাই। কাজী নজরুলের সেই কথা ‘আমাদের কেউ নেতা নেই, আমাদের বিবেক হল আমাদের নেতা।’ মানুষের মধ্যে যে সুকুমার বৃত্তি আছে সেই সুকুমার বৃত্তিকে লালন করার জন্য সামাজিক আন্দোলন দরকার। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জনগণের সামনে দলকে নিজেকে পরিচিত করার জন্য কখনও কখনও কাউন্সিল সম্মেলন করে নেতা মনোনীত হয়। তাদের এখন সামাজিক আন্দোলন কি যে তেমন খেয়াল থাকে না। সাধারণ রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের কাজ সরকারের অর্থ লুট করা এবং সরকারি আমলাদের লুট করতে সহায়তা দেওয়া। এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে কাজ না করে টাকা গুলো আত্মসাৎ করা এবং গ্রামে গঞ্জের স্বল্প শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের ঘুষ দিয়ে চাকুরীতে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করান, তাদের সাথে যোগাযোগ রেখে গ্রামের মানুষের বেকায়দায় ফেলে পুলিশের ঘুষ দিয়ে আসা আর এমপি, ডিসি, এসপির সাথে সম্পর্ক আছে, এমন বিষয়গুলো জনগণের সামনে উপস্থাপন করে নিজেকে ক্ষমতাবান হিসাবে জাহির করাই হলো ক্ষমতাসীন দলের নেতা কর্মীর মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে সামাজিক শক্তি কোথা থেকে তৈরি হবে? পাড়ায় মহল্লায় যে সকল যুব শক্তি আছে তাদেরকে যুক্ত করার জন্যই সামাজিক শক্তি দরকার। মূল্যবোধ এবং তাালণ্যের শক্তি দিয়ে এই সামাজিক শক্তি তৈরি হতে পারে। এখানে মহাজ্ঞানী মহাজন আকাশ থেকে পড়ে না, এই মাটি ও মানুষের মধ্যেই নিহিত থাকে। সমাজ ও রাষ্ট্রে এই মহান ব্যক্তিদের অনুস্মরণ করার জন্য সামাজিক শক্তির দরকার। জেলা উপজেলায় যারা অগ্রসর মানুষ তাদের মিলিত শক্তিতে হতে পারে একটি শক্তি। সেই শক্তির আকর্ষণে আমরা গ্রামে গ্রামে সামাজিক শক্তি গড়ে তুলতে পারি। সিন্ডিকেট নয়, সামাজিক শক্তিই পারে আমাদের মনের দরজা খুলে দিতে, সব বাধা দুর করে, আলোর মশাল জ্বেলে, আমরা অন্ধকার দুর করতে চাই। সামাজিক শক্তি দিয়ে নতুন মুক্তির ঠিকানা তৈরি করতে হবে। বই পড়ে জ্ঞানী যেমন ভাল ভাল কথা বলতে পারেন, আবার সমাজ শক্তির উপর জ্ঞানী যারা তারা তালণদের ঘুম ভাঙাতে পারেন, জাগিয়ে তুলে স্বপ্ন দেখাতে পারেন। সব জড়তা, হীনতাতে ঝেড়ে ফেলে মোলদণ্ড সোজা করে দাঁড় করাতে পারেন। ‘ আমি শপথ করিতেছি যে, সর্বদা নিজেকে দেশের সেবাই নিয়োজিত রাখবো।’-এই শপথ বাক্য বুকে ধারণ করে তরুণদের জাগাতে পারেন। ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন। সেখানে কে কবি, কে নেতা, কে কর্মী, কে বক্তা, কে শ্রোতা বড় কথা নয়, আমরা সবাই কর্মী। কাজের যে শক্তি সেই শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করেই আমরা তৈরি করতে চাই সামাজিক শক্তি। সেই শক্তি যেন কোনো কিছুকে ধক্ষংসে মেতে না ওঠে। শুধু আরও ভালোর জন্য আরও উৎকর্ষের জন্য যেন গতিময় হই। ধনী গরিব, হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবাইকে একটি প্লাট ফর্মে নিয়ে একটি পরিচয় মানুষ হিসাবে আমরা সামনে চলতে চাই, তার জন্যই সামাজিক শক্তির দরকার। পৃথিবীতে বড় বড় বিজ্ঞানী, লেখক-কবি, সাংবাদিক, রাজনীতিক কেউ শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবেন নি। সমাজ ও রাষ্ট্র এবং বিশ্বকে নিয়ে ভেবেছেন। এই ভাবনাটি আজ সামাজিক আন্দোলনে নিতে হবে। আসুন আমরা সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত হই।

Comments
Post a Comment